বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদে ১৯৯০ সালে যে মানবিক স্বপ্নের যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের আশ্রয়, শিক্ষা, ক্রীড়া প্রশিক্ষণ ও মানবিক বিকাশের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত ‘মহামুনি শিশু সদন’ এখন পাহাড়ের গর্বের প্রতীক। বলতে গেলে পাহাড়ের আলো ছড়ানো এক মানবিক প্রতিষ্ঠান এটি।
খোজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার সাবেক বিলছড়ি এলাকার ঐতিহ্যবাহী মহামুনি বৌদ্ধ বিহারকে কেন্দ্র করে এই শিশু সদন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, রুপসীপাড়া ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রয়াত চাহ্লা খইন মার্মা, মহামুনি বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ উ পাইন্দা উয়াইনচা মহাথেরো, মানবাধিকার কর্মী ও লামা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি এম রুহুল আমিন, কারাতে প্রশিক্ষক টিংমং রাখাইনসহ স্থানীয় সমাজের একাধিক মানবপ্রেমী ব্যক্তি।
এই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র পাহাড়ি কন্যা জ উ প্রু। তিনি সার্কসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক অর্জন করে বাংলাদেশের জন্য গৌরব বয়ে এনেছেন। জাতীয় পর্যায়েও তিনি বহুবার শ্রেষ্ঠ ক্রীড়াবিদ হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। তার সাফল্য প্রমাণ করেছে—পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও বিশ্বমানের ক্রীড়াবিদ তৈরি হতে পারে, যদি তাদের যথাযথ সুযোগ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
পাহাড়ের দরিদ্র ও অনাথ শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করা, যেখানে তারা শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি নিজেদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাবে। সেই মানবিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় মহামুনি শিশু সদন ধীরে ধীরে একটি সফল সামাজিক ও ক্রীড়া উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় বলে জানান পরিচালক জ উ প্রু। তিনি জানান,
পরবর্তীতে ফাদার লুপি এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লাসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় মহামুনি শিশু সদনের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়। বিশেষ করে ক্রীড়া ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে শুরু করে।
মানবাধিকার কর্মী এম রুহুল আমিন বলেন, বিশেষ করে মার্শাল আর্টে মহামুনি শিশু সদনের শিক্ষার্থীরা দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে। এই প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণ ও সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাহাড়ের প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পদক অর্জন করেছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ১০ম সাফ গেমস কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ উপলক্ষে মহামুনি শিশু সদনের খেলোয়াড়রা বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক থানজামা লুসাই ও জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খেলোয়াড়দের উৎসাহ প্রদান এবং আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হয় জানা গেছে।
এ দিকে লামা পৌরসভার সাবেক বিলছড়ি এলাকার বাসিন্দা জাহিদ হাসান ও বড় পাড়ার বাসিন্দা মংছিংপ্রু মার্মা জানায়, মহামুনি শিশু সদনের সাফল্য শুধু কয়েকজন খেলোয়াড়ের বিজয়ের গল্প নয়; এটি একটি সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাস। ১৯৯০ সালে যে ছোট্ট মানবিক উদ্যোগের সূচনা হয়েছিল, আজ তা পাহাড়ের শিশুদের স্বপ্নপূরণের অন্যতম আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।
এ বিষয়ে লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মঈন উদ্দিন জানান, প্রতিষ্ঠাতা ও সহযোগীদের ত্যাগ, প্রশিক্ষকদের নিষ্ঠা এবং শিক্ষার্থীদের কঠোর পরিশ্রমের সমন্বয়ে মহামুনি শিশু সদন আগামী দিনেও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও সাফল্য অর্জন করবে—এমন প্রত্যাশা লামাবাসীসহ পুরো বান্দরবানবাসীর।