টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের বিস্তীর্ণ এলাকার সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জেলার সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন প্রায় ১৮০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এসব সড়ক সংস্কার ও পুনর্নির্মাণে প্রাথমিকভাবে প্রয়োজন প্রায় ১৩৩ কোটি টাকা। সড়ক যোগাযোগের এই সংকটে কৃষিপণ্য পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষার্থীদের যাতায়াতসহ দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পর্যটন খাতেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। চলতি বর্ষায় পর্যটননির্ভর বিভিন্ন খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৬০ কোটি টাকার বেশি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠন।
ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে টাঙানো হয়েছে লাল নিশান
রবিবার ও সোমবার বান্দরবান সদর, রোয়াংছড়ি ও রুমার বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, এখনো সড়কের ক্ষত স্পষ্ট। কোথাও সড়কের একাংশ ধসে সরু হয়ে গেছে, কোথাও পিচ উঠে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। আবার কোথাও পাহাড়ি ঢলে সড়কের পাশের মাটি সরে গিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর খাদ। এসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে যানবাহন ও পথচারীদের সতর্ক করতে টাঙানো হয়েছে লাল নিশান।
রোয়াংছড়ি-রুমা সংযোগ সড়কের দেবতা পাহাড় ও খামতাং পাড়া এলাকাতেও দেখা গেছে এমন লাল নিশান। পাহাড়ের বুক চিরে এঁকেবেঁকে যাওয়া পিচঢালা সড়কটির বিভিন্ন অংশ এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
রুমার সেপ্রুপাড়া কারবারি হ্লাচিংউ মার্মা ও রোয়াংছড়ির রোনিনপাড়া কারবারি রামতিনখুপ বম বলেন, এসব লাল নিশান শুধু বিপজ্জনক সড়কের সংকেত নয়, পাহাড়ের মানুষের থমকে যাওয়া জীবনেরও প্রতীক। এর সঙ্গে আটকে আছে কৃষিপণ্য, হাসপাতালে যেতে না পারা রোগী, স্কুলে যেতে দুর্ভোগে পড়া শিক্ষার্থী এবং পর্যটননির্ভর মানুষের আয়-উপার্জন।
স্থানীয়রা জানান, সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বেড়ে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। কোথাও পাহাড়ধস, কোথাও সড়কধসে যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এখন পানি নেমে গেলেও ফসলি জমি, সবজি ক্ষেত, ফলের বাগান ও সড়কজুড়ে ধ্বংসের চিহ্ন রয়ে গেছে।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দারা জানান, ভারি বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ। সড়ক সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় অনেক জায়গায় মাঝারি ও ভারী যানবাহন চলতে পারছে না। ফলে সময়মতো কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া যাচ্ছে না। রোগী নিয়ে হাসপাতালে যেতে হচ্ছে ঝুঁকি নিয়ে। শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাতায়াতেও দেখা দিয়েছে দুর্ভোগ।
রোয়াংছড়ি-কচ্ছপতলী সড়কের কচ্ছপতলী পাড়ার বাসিন্দা মংপ্রু মারমা বলেন, এবারের বন্যায় খালপারের সড়কের বেশ কিছু অংশ ধসে গেছে। এখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষকে চলাচল করতে হচ্ছে। সড়কটি দ্রুত সংস্কার না হলে দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
রোয়াংছড়ি ও রুমার বাসিন্দারা বলেন, পাহাড়ে একটি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মানে শুধু যানবাহন চলাচলে সমস্যা নয়, এর সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকা জড়িয়ে আছে। যে সড়ক দিয়ে কৃষক ফলের বাগানে যান, একই সড়ক দিয়ে উৎপাদিত পণ্য বাজারে আসে। অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নেওয়া হয়, শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজে যায় এবং পর্যটকেরা পাহাড়ের প্রত্যন্ত দর্শনীয় স্থানে পৌঁছান। সড়ক ভেঙে গেলে একসঙ্গে থমকে যায় এসব কার্যক্রম।
কৃষিপণ্য পরিবহনে বড় বাধা
ব্যবসায়ীরা জানান, বান্দরবানের পাহাড়ি অর্থনীতির বড় একটি অংশ কৃষি ও ফলমূল উৎপাদননির্ভর। আম, কলা, আনারস, পেঁপে, ভুট্টা, শাকসবজিসহ নানা কৃষিপণ্য জেলার দুর্গম পাহাড়ি বাগান ও ক্ষেত থেকে সড়কপথে বিভিন্ন বাজারে আসে। কিন্তু সড়ক ভেঙে যাওয়ায় এসব পণ্য পরিবহন এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রুমার পাইকারি ব্যবসায়ী ইলিয়াস ও নাসির উদ্দিন জানান, তারা চন্দাপাড়া, থোয়াইবতংপাড়া ও খামতাং এলাকার কৃষকদের কাছ থেকে কয়েকটি আমবাগান নিয়েছেন। কিন্তু রুমা-রোয়াংছড়ি সড়কের বিভিন্ন অংশ ভাঙাচোরা থাকায় বড় যানবাহন চলতে পারছে না। সময়মতো বাগান থেকে আম নিয়ে আসতে না পারলে সেগুলো নষ্ট হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। এতে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে।
পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দারা বলেন, সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে জরুরি সেবায়। দুর্গম এলাকার কেউ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো কঠিন হয়ে গেছে। কোথাও অ্যাম্বুলেন্স কিংবা বড় যানবাহন চলতে না পারায় রোগী পরিবহনও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
টংকাবতী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মায়াং ম্রো প্রদীপ বলেন, সড়কের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। কোনোভাবে মোটরসাইকেল চলাচল করতে পারলেও মাঝারি বা বড় গাড়ি চলতে পারছে না। এতে স্থানীয়দের অনেক ভোগান্তি হচ্ছে। দ্রুত সড়ক মেরামত করে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করা প্রয়োজন।
পর্যটন খাতে ৬০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি
বান্দরবানের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত পর্যটন। পাহাড়, ঝরনা, হ্রদ ও উঁচু পর্বতশৃঙ্গ ঘিরে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় গড়ে উঠেছে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ, পর্যটকবাহী গাড়ি ও গাইডনির্ভর ব্যবসা। কিন্তু বর্ষার পাহাড়ি ঢল, পাহাড়ধস ও সড়কের ক্ষয়ক্ষতির কারণে এই খাতেও নেমে এসেছে স্থবিরতা।
ট্যুরিস্ট গাইডসহ পর্যটনসংশ্লিষ্টরা জানান, পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে যাতায়াতের অসুবিধার কারণে পর্যটকের সংখ্যা কমেছে। এতে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, কটেজ, পর্যটকবাহী গাড়ি ও ট্যুরিস্ট গাইডদের আয় কমে গেছে।
রুমার ট্যুরিস্ট গাইড আশীষ বড়ুয়া বলেন, বন্যা, পাহাড়ধস ও চলমান বৃষ্টিপাতের কারণে প্রাকৃতিক হ্রদ রাইক্ষ্যংপুকুর, ডাবল ফলস হিসেবে পরিচিত ত্লাবং ঝর্ণা বা ক্লিবুং, রৈক্ষ্যং ফলস এবং অন্যতম পর্বতশৃঙ্গ দুমলংয়ে যাতায়াত বন্ধ রয়েছে। এসব পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াত বন্ধ থাকায় রুমায় পর্যটকের সংখ্যা অনেক কমেছে। এতে পর্যটনসংশ্লিষ্টদের আয়-রোজগারও কমে গেছে।
বান্দরবান হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিধিনিষেধের কারণে জেলার হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট-কটেজ খাতে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এর সঙ্গে রেস্তোরাঁ, খাবারের দোকান, হস্তশিল্প, বিভিন্ন পণ্য ব্যবসা ও পরিবহনসহ পর্যটন খাতের অন্যান্য হিসাব ধরলে চলতি বর্ষায় জেলার পর্যটননির্ভর বিভিন্ন সেক্টরে ৬০ কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
১৮০ কিলোমিটার সড়কের ক্ষতি, সংস্কারে প্রয়োজন ১৩৩ কোটি টাকা
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানে সওজ, এলজিইডি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন প্রায় ১৮০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব সড়ক সংস্কার ও পুনর্নির্মাণে তিনটি সরকারি দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী প্রয়োজন প্রায় ১৩৩ কোটি টাকা।
সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, রাঙ্গামাটি-বান্দরবান সড়কের একটি বেইলি সেতু ধসসহ নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী থেকে নাইক্ষ্যংছড়ি সদর-কক্সবাজার অভ্যন্তরীণ সড়কের প্রায় ৬৩ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রাথমিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭৩ কোটি টাকা। ক্ষয়ক্ষতির হিসাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী প্রতিপদ দেওয়ান জানান, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতাধীন রুমা-রোয়াংছড়ি-কচ্ছপতলী, সুয়ালক-সরই এবং ব্রিকফিল্ড বাজার-চিম্বুক সড়কসহ প্রায় ৯০ কিলোমিটার বিভিন্ন সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব সড়কে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০ কোটি টাকা। ক্ষয়ক্ষতির হিসাব হেড অফিসে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংস্কারকাজ শুরু করা হবে।
অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন প্রায় ২৫ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত সড়কে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২১ কোটি টাকা বলে জানিয়েছেন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বিন ইয়াছির আরাফাত।
বান্দরবানের বিভিন্ন সড়কে টাঙানো লাল নিশান তাই এখন শুধু সতর্কতার প্রতীক নয়, পাহাড়ের যোগাযোগ, কৃষি, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পর্যটননির্ভর অর্থনীতির সংকটেরও দৃশ্যমান চিহ্ন হয়ে উঠেছে।










