
মো. নুরুল করিম আরমান |
পার্বত্য বান্দরবান জেলার সবচেয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ লামা উপজেলা। এ উপজেলার শহর থেকে গ্রামে সরকারের নানা উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কাজ করে যাচ্ছেন বিভিন্ন দপ্তরের শতশত কর্মকর্তা-কর্মচারী। কিন্তু এসব কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য সরকারিভাবে আবাসিকের ব্যবস্থা না থাকার কারণে একদিকে যেমন কর্মকর্তা কর্মচারীরা চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন, তেমনি ব্যাহত হচ্ছে উপজেলার জরুরী নাগরিক সেবাও। একটি পৌরসভা, সাতটি ইউনিয়ন ও একটি থানা নিয়ে গঠিত এ উপজেলার উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা পরিষদসহ বিভিন্ন দপ্তরে ১ হাজার ৩২৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন। চরম আবাসন সংকট নিরসনে দ্রুত আবাসিক গেজেটেড কোয়ার্টার ও ডরমিটরি নির্মাণের দাবী তুলেছেন ভুক্তভোগী কর্মকর্তা কর্মচারীরা।
উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ১৯২০ সালের ৭ সেপ্টেম্বর লামা থানা গঠিত হয়। ১৯৭০ সালের ৯ অক্টোবর আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি, বাইশারী ও গজালিয়া থানাকে নিয়ে এটি ‘লামা মহকুমা’য় উন্নীত হয়। ১৯৮৩ সালে দেশের সব মহকুমা বিলুপ্ত করে জেলা ঘোষণার সময় তৎকালীন সরকারি প্রজ্ঞাপনে লামাকে জেলা ঘোষণা করা হলেও তা মাত্র ৩ দিন স্থায়ী হয়েছিল। তবে মহকুমা ও জেলা ঘোষণার ইতিহাসের কারণে একটি জেলা শহরে সরকারের প্রশাসনিক কাজের যতগুলো দপ্তর থাকে, তার প্রায় সবই রয়ে গেছে এই উপজেলায়। বন বিভাগ ও পোস্ট অফিস বাদে বর্তমানে উপজেলায় সরকারের ৩৩টি দপ্তর রয়েছে। এসব দপ্তরে বর্তমানে ১৪২ জন কর্মকর্তা এবং ১ হাজার ১৮৩ জন কর্মচারীসহ সর্বমোট ১ হাজার ৩২৫ জন কর্মী কর্মরত রয়েছে।
অপর একটি সূত্র জানায়, আবাসন সংকটের নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়ছে দাপ্তরিক কাজে। দূরবর্তী স্থান থেকে যাতায়াত করতে গিয়ে যেমন সময় অপচয় হচ্ছে, তেমনি অতিরিক্ত মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তির কারণে ব্যাহত হচ্ছে নাগরিক সেবা। বিশেষ করে জরুরী সেবার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মস্থলে সার্বক্ষণিক অবস্থান করতে হিমশিম খাচ্ছেন।
সরেজমিন দেখা যায়, উপজেলা শহরের বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মেসে বা জরাজীর্ণ বাসা-বাড়িতে কয়েকজন কর্মচারী একসঙ্গে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন। আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে থাকছেন অতি সাধারণ পাহাড়ি ঘরবাড়িতে, যেখানে ন্যূনতম নাগরিক সুযোগ-সুবিধাও নেই। দূর-দূরান্ত থেকে বদলি হয়ে আসা চাকরিজীবীদের কর্মস্থলে যোগ দিয়েই পড়তে হচ্ছে চরম আবাসন সংকটে। সুনির্দিষ্ট আবাসন ব্যবস্থা না থাকায় স্থানীয় এলাকায় চড়া মূল্যে বাসা ভাড়া নিতে বাধ্য হচ্ছেন সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীরা। অনেকেই বাধ্য হয়ে পরিবার-পরিজন দূরে রেখে একাকী মেস জীবন কাটাচ্ছেন।
লামা উপজেলা প্রশাসনের উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা উচিংমে চাক বলেন, নারী হিসেবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আবাসন সুবিধা না থাকাটা সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা সংকট। পরিবার নিয়ে থাকার মতো ভালো বাসা এখানে পাওয়াই যায় না, আর পেলেও ভাড়া আকাশচুম্বী। এদিকে সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা বামং সিং মার্মা জানায়, অফিস শেষ করে একটু শান্তিতে যে বিশ্রাম নেব, সেই পরিবেশটুকুও নেই। ভাঙাচোরা মেসবাড়িতে থাকতে হয়। ডরমিটরি থাকলে উপজেলাবাসী আরও বেশি সেবা পেত।
উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা কাঞ্চন দে বলেন, পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে যারা নিজেদের শ্রম ও মেধা উৎসর্গ করছেন, তাদের ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সময়ের দাবি। সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটি আধুনিক ডরমিটরি বা কোয়ার্টার নির্মাণ এখন আর কেবল বিলাসিতা নয়, বরং সেবার মান বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে।
সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের আবাসন সংকটের সত্যতা স্বীকার করে লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মঈন উদ্দিন জানান, বান্দরবানের ৭টি উপজেলার মধ্যে ৬টিতেই অফিসার্স কোয়ার্টার ও ডরমিটরি থাকলেও, কেবলমাত্র লামা উপজেলাতেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো আবাসন ব্যবস্থা নেই। ইউএনও আরও জানায়, উপজেলায় সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য আবাসিক গেজেটেড কোয়ার্টার ও ডরমিটরি নির্মাণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের নিকট ইতোমধ্যে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে প্রস্তাব আকারে সম্ভাব্য স্থানগুলোর নকশা তৈরি ও পরিচিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে। আশা করি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত অনুমোদন পাওয়া গেলে উপজেলায় আবাসিক গেজেটেড কোয়ার্টার ও ডরমিটরি নির্মাণের মাধ্যমে বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীদের আবাসন সংকট নিরসন সম্ভব হবে।