দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়-মেডিকেল কলেজে ৩৮জন শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পাওয়ার মধ্য দিয়ে আবারো প্রমাণ হলো দুর্গম পাহাড়ে শিক্ষার আলোর দৃষ্টান্ত ‘কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজ’। বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নের বোধিছড়া এলাকায় এ ‘কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজ’র অবস্থান। এ প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের সার্বিক সহযোগিতায় পাহাড়ের পিঁছিয়ে পড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠির শিক্ষার্থীরা উচ্চ শিক্ষার এ সুযোগ পেল। তাই উচ্ছ্বাসিত উপজেলার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি ও বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর মানুষ। এ প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশুনা করে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত আছে আরও ৩০০জন। ভবিষ্যতে নিজেদের পরিবার ও নিজ সম্প্রদায়ের পাশাপাশি দেশের জন্য কাজ করতে চান ভর্তির সুযোগ পাওয়া এসব শিক্ষার্থীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০১ সালে দরিদ্র পরিবারের ৭জন শিশু শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করে কোয়ান্টাম কসমো স্কুল। ধীরে ধীরে এটি কলেজে রুপান্তরিত হয়। যেখানে প্রতি বছরই থাকে শতভাগ পাশের হার। বর্তমানে তিন পার্বত্য জেলাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার আড়াই হাজারের বেশি শিশু-কিশোর সম্পুর্ণ ফ্রীতে খাওয়া থাকাসহ লেখাপড়া করছে কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সুবিধাবঞ্চিত ছেলে-মেয়েরা এখানে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠছে সুশৃঙ্খল পরিবেশ, লেখাপড়া, মেডিটেশন, কোয়ান্টাম ব্যায়াম, খেলাধুলা, শুদ্ধাচার চর্চা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। এর ধারাবাহিক সাফল্যে চলতি বছর শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পায় ধনলাল ত্রিপুরা, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজে উছাইহ্লা মারমা ও মাগুরা মেডিকেল কলেজে অংক্যসিং মারমা। চুয়েেেট মংথুইনু মারমা, জিসান তঞ্চগ্যা ও রুয়েটে শফিকুল ইসলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেল লাল নেই সাং বম, ওয়াইংজ্য মার্মা, ইয়াসিনুর রহমান পরান, ওয়ারেছুল হক রিয়াদ, শৈমংসাই মারমা, সৈকত উদ্দিন আহমেদ, জুলিনময় ত্রিপুরা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্যাল এডুকেশন এন্ড স্পোর্টস সায়েন্স বিভাগে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে নেওয়ান চাক, অনিল তংচংগ্যা, মো. সজীব, সজীব কিসকো, মোছা: আয়েশা খাতুন ও মোছা: শাহনাজ খাতুন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে আরও সুযোগ পায় রেশমি সাঁওতাল, সারজিনা আক্তার, মোছা: লাবিবা তাজরিন ও সজীব খিয়াং। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগে ভর্তির পেয়েনে মো. জাহিদ হাসান। এছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগে ফুংপ্রে মুরুং এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিন্টমেকিং বিভাগে মংনুসিং মারমা ভর্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। পটুয়াখালী নার্সিং ইনস্টিটিউটে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে কাজল চাকমা। সম্প্রতি সফল শিক্ষার্থীদের এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরও ১০ জন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অপেক্ষমান তালিকায় আছে অন্তত ৬জন শিক্ষার্থী। এসব শিক্ষার্থীদেরকে যোগ্য করে তোলার পাশাপাশি ভর্তির বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতা করে কোয়ান্টাম ফাইন্ডেশন। ২০২৪ সালেও এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মধ্যে ২৫ জন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায়।
মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেয়ে অনুভূতি প্রকাশ করে শিক্ষার্থী ধনলাল ত্রিপুরা বলেন, ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মাঝে আমি একজন শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে পেরে খুবই আনন্দিত। পাশাপাশি কোয়ান্টাম কসমো স্কুল এন্ড কলেজের সকল শিক্ষকসহ কর্তৃপক্ষের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ধনলাল ত্রিপুরা। তিনি ডাক্তারি পাশের পর দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে চান।শত প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তাদের এ সাফল্যে যেমন খুশি এ জনগোষ্ঠী ও তাদের শিক্ষকরা। তেমনি শংকা পড়লেখায় তাদের ব্যয়ভার নিয়েও। শিক্ষার্থী ওয়াইংজ্য মার্মার বাবা উবাথোয়াই মার্মা জানান, আমরা পাহাড়ি। আমার বাড়ি নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়। জুম চাষ করে ভালো মতে সংসারও চালাতে পারিনা। তাই ছেলেকে শিশুকালেই ছেলেকে কোয়ান্টামে ভর্তি করি। এ কারণে ছেলেটা আজ মেডিকেলে ভর্তির সুযোগে পেয়েছে। এতে আমি ও আমার পরিবারের সকল সদস্য কোয়ান্টামের কাছে চিরকৃতজ্ঞ।
কোয়ান্টামম কর্তৃপক্ষের নিকট কৃতজ্ঞা প্রকাশ করে বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদের লামা উপজেলা শাখার সভাপতি মহেন্দ্র ত্রিপুরা জানায়, এতদিন ত কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় পড়াশুনা হয়েছে তার। জানি না ভবিষ্যতে সে কিভাবে পড়াশোনার খরচ চালাবে, কারণ সে খুবই গরীব জুমিয়া পরিবারের সন্তান।
৩৮ শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে কোয়ান্টাম কসমো কলেজের ইনচার্জ ছালেহ আহম্মদ বলেন, এরা সবাই শিশুকালেই কোয়ান্টাম স্কুল এন্ড কলেজে ভর্তি হয়েছিল। কোয়ান্টাম কর্তৃপক্ষের সার্বিক তত্বাবধানে তাদের গড়ে তোলা হয়। গেল এইচএসসি পরীক্ষায় পাশ করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পায় ৩৮ কোয়ান্টা শিক্ষার্থী। তিনি আরো বলেন, গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা এখনও অনুষ্ঠিত হয়নি এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কার্যক্রম এখনও চলমান রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশুনা করে দেশের বিভিন্ন বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে ৩০০জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছেন বলেও জানান ছালেহ আহম্মদ।
এদিকে লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মঈন উদ্দিন জানান, এ অর্জন শুধু কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজের সাফল্য নয়, এটি পাহাড়ের শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণাও বটে। তাই পাহাড়ে এ প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার আলোর দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে মনে করি।
উপদেষ্টা সম্পাদক : সাংবাদিক প্রিয়দর্শী বড়ুয়া, সম্পাদক : মো. নুরুল করিম আরমান, আইন সম্পাদক : ফয়সাল আজিজ
কার্যালয় : লামা প্রেসক্লাব ভবন (২য় তলা), প্রধান সড়ক, লামা পৌরসভা, লামা, বান্দরবান পার্বত্য জেলা, মোবাইল : ০১৭৫০৪৪৪৯৯৬.
ই-মেইল : paharerkatha@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত